ঘুরতে যাবার নেশাটা ছিলো সেই ছোটো বেলা থেকেই । ইচ্ছে থাকলেও উপায় খুব একটা ছিল না তখন । ছোট বেলা হোস্টেলে থেকে মানুষ হয়েছি তাই জীবনটা একটা গন্ডি তেই সীমাবদ্ধ ছিল । বছরে ছুটির ৩ মাস বাদ দিয়ে বাকি ৯ মাসই কাটতো হোস্টেলের গন্ডির ভিতরে । ওটাই জগৎ, ওটাই পৃথিবী, ওটাই ছিল ঘর । খুব যে ছোট ছিল তা নয় , বিশাল বড় জায়গা নিয়ে বানানো । খেলার মাঠ , স্নানের পুকুর , স্কুল বিল্ডিং , খাবার জন্য বড় হল , মন্দির , চাষের জমি , ফুলের বাগান থেকে শুরু করে গরুর গোয়াল কি ছিল না সেখানে । পাঁচিলে ঘেরা স্বয়ং-সম্পুর্ন একটা অন্য জগৎ , কেউ যেন লুকিয়ে আলাদা করে রেখেছে বাকিদের থেকে । যাকে উপভোগ করার অধিকার শুধু আমাদের , বাইরের কারো ছিল না । তাই ওই জীবনটার বাইরেও যে আরো কিছুর দরকার থাকতে পারে সেটা কোনো দিন অনুভব করতে হয়নি ঠিকই তবে বাইরের পৃথিবী ঘুরে দেখার জন্য লোভ ছিল আগাগোড়া ।
ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর চাইলেই একটা ভালো চাকরি নিয়ে কলকাতা তেই থেকে যেতে পারতাম । সারাদিন কাজ করে ফিরে রাতে মায়ের কোলে মাথা রেখে শান্তির ঘুম , এর থেকে ভালো আর কি হতে পারে ? মা বাবা ভাই আর আমার প্রেমের কলকাতা , এদের বাইরেও তো কিছু আছে এই ধরাধামে । নতুন কিছু দেখা , নতুন কিছু শেখা , নতুন কিছু করা এটাই তো প্রগতিশীল মানব জাতির লক্ষণ । সেই নতুন কিছু পাবার হাতছানি উপেক্ষা করি কি করে !? পড়াশুনা শেষ করেই বেরিয়ে পড়েছিলাম বাইরের কোনো শহরের উদ্দেশ্যে । প্রথমে ব্যাঙ্গালোর তারপর স্বপ্নের নগরী মুম্বই । স্বপ্নের নগরী যে কতটা স্বপ্নে ঘেরা সেটা পড়ে একদিন বলবো । সে যাইহোক , নতুন জায়গা নতুন লোক কখনো বিচলিত করেনি বরং ভালোই লাগে । নতুন সংস্কৃতি নতুন ভাষা অন্য চালচলন সেসব কি শুধু বই পড়ে জানতে পারতাম ! অনেকে বলে “কি দরকার ওসবে? এই তো ভালোই আছি ঘরেই” । তারাও ভুল কিছু বলেনা , তারা তাদের চিন্তাধারায় ঠিক আর আমি আমার মতো করে ঠিক ।
তবে সত্যি বলতে কি , আমি জীবনের সত্যিকারের শিক্ষা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পেয়েছি । নতুন কোনো শহরে যেখানে কাউকে চেনো না সেখানে মাথা গোজার মতো জায়গা জোগাড় করাটাই যে কত বড় শিক্ষা সেটা হয়তো বই পড়ে শিখতে পাইতাম না । আগে ঘরে কোনোদিন বাজার পর্যন্ত করে নিয়ে আসিনি কিন্তু এখন তো নিজের খাবার টাও কখনো কখনো নিজেকেই বানিয়ে খেতে হয় । এই টুকু আত্মনির্ভরশীল যে হতে পেরেছি সেটাই অনেক বড়ো পাওনা আমার কাছে ।
একদম শুরুতেই বলেছি যে ঘুরতে যাবার নেশা ছোট বেলা থেকেই তাই হাথে পাওয়া সুযোগ ছাড়ি কি করে ! সুযোগ পেলেই বেরিয়ে যাই নতুন অভিজ্ঞতা নতুন রোমাঞ্চকর কিছুর খোঁজে । সপ্তাহের ৫ টা দিন অফিসের জন্য আর বেঁচে থাকা দুটো দিন শুধু আমার । দুনিয়ার বাকি সবার কথা ভুলে সব চিন্তা জলাঞ্জলি দিয়ে কিছুটা স্বার্থপরের মতোই বেরিযে পরি পিঠে ব্যাগ নিয়ে । কখনো পাহাড় , কখনো সমুদ্র কখনও বা ঝর্ণা , আরো কত কি । প্রতিবারই নতুন বিস্ময় নিয়ে দেখি সবকিছুকে । এই তৃষ্ণার কোনো শেষ নেই , দিন দিন বেড়েই চলেছে ক্রমশ । আমার এক প্রিয় বন্ধু খুব ভালো একটা কথা বলেছিলো “ তুই তো ভারত ভ্রমণে বেরিয়েছিস , চাকরীটা তো শুধু ঘোরার টাকা জোগানোর জন্য “ । কথাটা কতটা সত্যি জানিনা তবে শুনতে সত্যি খুব ভালো লেগেছিলো ।
এখন ২৫ বছর বয়স আমার । এর মধ্যে ২৩ টা বছর কাটিয়ে দিয়েছি বাবা মা ভাই বোনের কথা ভেবে । হয়তো আরো ৪/৫ বছর পর বিয়ে করে নিতে হবে , তখন হয়তো বউ বাচ্চা নিয়েই নতুন জীবনের শুরু ।নিজের জন্য বাঁচা , স্বপ্ন পূরণ সেগুলোর জন্য সময় কোথায় ! এই দুটো ধাপের মাঝে যে এই ৫/৬ বছর অবশিষ্ঠ সেটাই সময়। সেটা সম্পূর্ণ আমার , সেখানে না আমি কারো কথা শুনতে চাই না কারো সঙ্গে কোনো আপোস করতে চাই। অনেক কবি লিখেছেন যে জীবন মনে নাকি অন্যের জন্য বাঁচা । সত্যিই কি তাই , আমরা সাংসারিক প্রাণী বলে কি নিজের জন্য বাঁচার কোনো সুযোগ পাবোনা ।? অন্যদের কথা জানিনা তবে আমি নিজের জন্য বাঁচতে চাই । নাহলে আরো 20/2৫ বছর পর যখন আধা বুড়ো হয়ে যাবো তখন কোনো একদিন সকালে উঠে হয়তো অতীতের মানে এই সময়ের কথা ভেবে আফসোস করতে হবে ।হয়তো ভাববো “সময় ছিল , সুযোগ ছিল কিন্তু জীবন টা বাঁচার মতো করে বাঁচতে পারলাম না”। আমার কথা গুলো হয়তো স্বার্থপরের মতোই শোনাচ্ছে , জানি । তা শোনাক , স্বপ্নের হাতছানির জন্য একটু স্বার্থপর তো হতেই হবে । হাহাহা !
শুভরাত্রি ।।।