Showing posts with label Prem. Show all posts
Showing posts with label Prem. Show all posts
1

মনময়ুরী

By


       জানালা গুলোর ঝাপটানির আওয়াজে বিকেলের ঘুমটা ভেঙ্গে গেল । ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখি বাইরে মেঘ ঘনিয়ে এসেছে  সঙ্গে একটু ঝর । আর শুয়ে থাকতে পারলাম না । তাড়াহুড়ো করে উঠে গেঞ্জি টা কোন রকম গলিয়ে ঘরের বাইরে বেরোলাম , তারপর সোজা এক দৌরে ছাদে । ছাদের রংচটা , কানা ভাঙ্গা দরজা টা ঝরের ঝাপটায় কাপতে শুরু করেছে । ছাদে প্রথম পা দিতেই দমকা হাওয়া এসে বুকে আছড়ে পরল জোরে । দুরের গাছগুলো তখন মাথা নাড়াচ্ছে হাওয়ার সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে । পাশের বাড়ির ছাদে মেলা একটা কাপড় উরে এসে পরল আমার পায়ের কাছে । ছাদের চিলেকোঠার শালিখের বাসাটা ভেঙ্গে গেছে কখন ঝরের ঝাঁপটায় । ছাদের পাশের শিরীষ গাছটার শুকনো পাতা গুলো ছাদময় ছরিয়ে একাকার হয়ে গেছে চারিদিকে । দুরে পশ্চিম দিকে সূর্যিমামা ক্লান্ত হয়ে বিদায় জানাচ্ছিল তখন । মেঘ কে উপেক্ষা করে গোধূলির আলো তখনো উঁকি দিচ্ছে , সেই আলোয় রাঙিয়ে আছে পশ্চিমের মেঘ গুলো ।

    দু ফোঁটা বৃষ্টি এসে পরল আমার গায়ে । ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির মাঝে দারিয়ে হাথ দুটো ছরিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রইলাম কিছুক্ষন । প্রান ভরে উপভোগ করতে চাইলাম বছরের প্রথম বৃষ্টি । তখন মনে পরে গেল শেষ বছরের এরকম এক দিনের কথা । এক বিকেলে এরকম ই ভিজতে এসেছিলাম ছাদে । বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা গুলোকে উপেক্ষা করে দারিয়েছিলাম আকাশের দিকে তাকিয়ে । পাশের বাড়ির বিক্রমদার ছাদে চোখ যেতেই চোখ আটকে গেছিলো সেদিকে । আমার সমবয়েসি একটা মেয়ে ছাদ ময় নেচে বেড়াচ্ছে আপন মনে । খোলা চুলে হাথে ওড়না টাকে টাকে দুহাথে ধরে ছরিয়ে দিচ্ছিল আকাশের দিকে । যেন সে বৃষ্টি গুলোকে ওড়নাতে আটকে নিতে চায় । নীল হলুদ চুড়িদারে যখন ওড়না ছরিয়ে নাচছিল , সে নাচ মেঘলা বিকেলের বনময়ূরের নাচের থেকেও বেশি সুন্দর । চোখ বন্ধ করা সেই হাসি মুখ টা মুহূর্তের মধ্যে গেথে গিয়েছিল মনে । নির্ভেজাল সেই হাসি মন কেরে নিতে পারে সবার । জীবনের অন্য সব দুঃখ কষ্ট ভুলে সে যেন শুধু সেই মুহূর্তটুকু প্রান ভরে আপন করে নিতে চায় । ভেজা চুলে হাথ বোলাতে বোলাতে যখন চুল ঝারতে গেছিলো ও , তখনি চোখাচুখি হল দুজনের । থেমে গিয়ে ছাদের দেয়ালের পাশে এসে দারাল , আমিও অন্য দিকে দেখার ভান করেছিলাম । আড়চোখে কয়েকবার তাকিয়েছিলাম , বুঝেছিলাম সে ও তাকাচ্ছে । এবার একটু লজ্জার হাসি মুখে । ওড়না টাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে একটু অন্য দিকে তাকাল । তারপর এরকম ভাবেই কাটল কিছুক্ষন । নিচের থেকে নীলা বলে একটা ডাক আসায় একটু মুচকি হেসে চলে গিয়েছিল সে । এর আগে বৃষ্টি টাকে কোনদিন আমার এত ভালো লাগেনি  ।

    পরে জেনেছিলাম বিক্রমদার মামার মেয়ে ও । তারপর থেকে বৃষ্টি হলে রোজ আসি ছাদে , সেই বনময়ূরীর নাচ দেখব বলে । আবার হয়তো সেই চুলখোলা নিস্পাপ হাসি মুখ টা দেখতে পাবো , সেই আশায় । মেঘ হয় , বৃষ্টি ও আসে কিন্তু ময়ূরী আর আসে না ।।
0

প্রথম চিঠি

By

প্রিয় ময়ূরী  ,
আশা করি এখন তুই ভালোই আছিস । তোকে অনেক দিন থেকে এটা লিখবো ভেবেছিলাম , সাহস হয়নি কোনদিন । আজ আর না লিখে পারলাম না রে । ভুল ভাবিস না প্লিজ ।
      হ্যা , আমি তোকে ভালোবাসি । সেই প্রথম যেদিন দেখেছিলাম ,সেদিন থেকেই । প্রেমটা বড় অদ্ভুৎ জানিস ! মানুষটাকে পুরো পালটে দেয় । আগে সন্ধ্যা বেলা মাঠে বসে বন্ধু দের সঙ্গে আড্ডা দিতে বেশ লাগতো , এখনো মাঠে যাই কিন্তু আড্ডা টা আর জমে না । মাঠের কোনে বাদাম গাছ টায় হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি । বসন্তের সন্ধ্যায় দখিনা হাওয়া আমার মনটাকে দুলিয়ে চলে যায় । আকাশের দিকে তাকিয়ে  গুটি কয়েক মেঘের কুন্ডলি আর একগুচ্ছ মিটমিটে তারার মাঝে যখন নিরেট গোল পূর্ণিমার চাঁদ টাকে দেখি , তখন বুকের ভেতর টা এক অজানা কারনে খুশি তে ভরে ওঠে । তোর মুখ টা আমি ওই চাঁদের মধ্যে দেখতে পাই । যেন তুই একগাল হেসে আমার দিকে তাকিয়ে আছিস । গাছের পাতার ফাক দিয়ে  চাঁদের আলো এসে যখন আমার গায়ে পরে , মনে হয় তুই যেন জরিয়ে ধরেছিস আমায় । নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় যখন গাছের পাতা গুলো হাওয়ায় দুলে একটু শব্দ করে , মনে হয় তুই যেন আমার কানে কানে কিছু একটা বলে গেলি । মেঘ , চাঁদ , হাওয়া , পাতা এসব আগেও ছিল কিন্তু ওরা এর আগে কোনোদিন আমায় অবাক করেনি এরকম । আগে শুধু অগুলোকে দেখতাম , এখন অনুভব করতে পারি নিজের মধ্যে ।
স্কুলে রোজ যখন তুই পড়া শুনিস মন দিয়ে , আমি তখন শেষ বেঞ্চ থেকে মন দিয়ে শুধু তোর দিকে তাকিয়ে থাকি । পড়া আর আজকাল শোনা হয় না । স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশানে তোর আবৃতি করা কবিতা টা আমি পুরোটা মুখস্ত করে নিয়েছি , একদিন তোকে শোনাবো বলে । এখন আমি রোজ তারাতারি ঘুম থেকে উঠি তোকে দেখার জন্য । রোজ সকালে যখন আমার বাড়ির সামনে থেকে টিউশন যাস আমি ছাদ থেকে উকি মেরে দেখি । মা একটু অবাক হয়েছেন এখন রোজ এত তারাতারি ঘুম থেকে ওঠার জন্য । তোর একটা রুমাল হয়তো হারিয়ে গেছে  তাইনা ? ওটা তুই ক্লাসে ফেলে রেখে গেছিলি । আমার কাছে ই আছে এখন ,  যত্ন করে রেখে দিয়েছি ওটা ।
সেদিন তোকে আমি পুকুর ধারে দেখেছিলাম , যখন তুই ঘাটের পারে বসে জলে পা দোলাচ্ছিলি আর গুন গুন করে কি যেন একটা গাইছিলি । তোর জলে ভেজা পায়ে নূপুর টা হিরে বসানো গয়নার থেকেও বেশি সুন্দর লেগেছিল আমার । মনে হয়েছিল , জলের সঙ্গে মিশে গিয়ে একবার ছুয়ে আসি তোকে । গলাপি ঠোঁটে হাসি মুখ টা কিছুতেই ভুলতে পারিনি এখনো । মনে হয়েছিলো তোর কলে মাথা দিয়ে শুয়ে জীবনের সব একাকীত্ত জলাঞ্জলি দিয়ে দি । তুই যেন তখন আমার দিকে তাকিয়ে আমার মাথায় হাথ বুলিয়ে দিস । নাহয় কিছুক্ষন দুজনে দুজনার দিকে তাকিয়ে থাকব একদৃষ্টে । পৃথিবীর সব বাধা বিঘ্ন উপেক্ষা করে আমি একবার জরিয়ে ধরব তোকে ।
অগোছালো জীবন টা একটু গোছাতে শিখেছি এখন । আগে বাবার মার খুব ভয় পেতাম , এখন তোকে হারানোর ভয়টা সেটার থেকেও অনেক অনেক বেশি । ভালোবাসা সত্যিই মানুষকে পালটে দেয় । তোর উত্তরের আশায় রইলাম ।

~ইতি অনিরুদ্ধ 
2

মিতালি { প্রথম আধ্যায় }

By

part 1

  সেদিন  স্কুল শেষে বাড়ি ফিরছিলাম , ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেল । বাড়ির গলিটায় ঢোকার আগে একটা সরকারি কোয়াটার পেরে । ৪ তলার ২ টো বিল্ডিং,  সেগুলো পাঁচিল দিয়ে ঘেরা আর সামনে একটু বাগান মতো আছে । বাগান আর নেই , পরিচর্যার অভাবে আগাছায় ভরা । ওটার সামনে থেকে আসার সময় দেখলাম গেটের সামনে একটা বড় গাড়িতে মাল বোঝাই করা আর পাশে একটা ট্যাক্সি । মনেহয় নতুন কেউ এসেছে এখানে । এমনিতেই দেরি হয়ে গেছিলো ফিরতে তাই আর সময় না বাড়িয়ে তারাতারি ফিরে এলাম বাড়ি ।

    পরদিন ক্লাসে  এসে রোজকার মতো লাস্ট বেঞ্চে গিয়ে বসলাম নায়নের পাশে । আমি নয়ন আর আবীর সেই ক্লাস ফাইভ থেকে এই স্কুলে পরছি  । স্কুলের প্রথম দিন দেরি করে আসার জন্য আমরা শেষ বেঞ্চে জায়গা পেয়েছিলাম , তারপর থেকে ওটাই আমাদের পাকা জায়গা । ক্লাসরুম পাল্টেছে কিন্তু আমাদের শেষ বেঞ্চ টা কেউ কেরে নিতে পারেনি ।   এখন তো ওটা আমাদের কেনা জায়গার মতো হয়ে গেছে , ভুল করেও এটায় কেউ বসেনা আমরা ছাড়া । মিনিট দুয়েক পর আবীর চলে এল , বেঞ্চের কাছে এসে আমার পাশে ব্যাগ টা রেখে বলল
- সুনতে পেলাম আমাদের ১১ সায়েন্স এ একটা নতুন মেয়ে এসেছে ।
- এই সময় নতুন অ্যাডমিশন ? ক্লাস তো প্রায় ১ মাস আগেই শুরু হয়ে গেছে ! সে যা হয় হোক , আমার কি !
বলে আমি একটু সরে ওকে বসার জায়গা করে দিলাম । একে একে সবাই প্রায় চলে এসেছে । স্কুল সুরুর ঘণ্টা পরে গেছে । আমরা তখন আড্ডায় মত্ত , খেয়াল করিনি স্যার যে কখন চলে এসেছেন । সবাইকে চুপ করে যেতে দেখে ঘুরে দেখি স্যার চলে এসেছেন । আমরাও দারালাম ।স্যার সবাইকে হাথ নারিয়ে বসতে ঈশারা করলেন । বসার পর খেয়াল করলাম যে স্যার এর পাশে একটা মেয়ে । আগে দেখিনি কোনদিন , বোধহয় সেই নতুন মেয়েটা যার কথা আবীর বলছিল । স্যার বলতে শুরু করেছেন ততক্ষনে
- এ তোমাদের  নতুন বন্ধু মিতালি সেন , আজ এখানে এসেছে । দেরি করে অ্যাডমিশন নিয়েছে তাই তোমরা সবাই একটু হেল্প কোরো ওকে ।

     আরও অনেক কিছু বলেছিলেন স্যার কিন্তু সেগুলো শোনা হয়নি । আমি ওর দিকে তাকিয়ে কখন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেছি বুঝতে পারিনি । আর পাঁচটা সাধারন মেয়ের মতো ও নয় , একটু আলাদা । অন্তত প্রথম দেখায় তাই ই মনে হয়েছিল । বাকি মেয়েদের মতো মেয়েটা রোগা নয় ,আবার মোটাও না । চুল  পরিপাটি করে বাধা । চোখে একটা শান্ত ভাব , মুখে হাল্কা হাসি । শান্ত হয়ে নিচের দিকে মুখ করে দারিয়ে আছে । মুখটা খুব মায়াবি ,চোখ ফেরাতে পারিনি কয়েক মুহূর্ত ।  তারপর দেখলাম আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে এবং আমাদের একটা বেঞ্চ আগে এসে বসল । স্যার এর দিকে তাকিয়ে দেখি স্যার আমাদের বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে ।  আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল
- কোনো রকম অসুবিধা যদি ওর হয় তাহলে কি করে তোদের সায়েস্তা করতে হয় আমার জানা আছে ।
বলে স্যার নিজের চেয়ারে বসে নাম ডাকা শুরু করলেন । আমরা ভালই বুঝতে পেরেছিলাম যে শেষের হুমকি টা আমাদের এ জন্য । বাঁদরামি করার জন্য যে আমাদের সুখ্যাতি আছে সেটা আমরা ভালো করেই জানি । কত ক্লাস  যে আমাদের কান ধরে ক্লাসের বাইরে দারিয়ে থাকতে হয়েছে গোনা নেই ! আগে ওটাকে উপভোগ করতাম কিন্তু এখন একটু গায়ে লাগে ।  পাশে ঘুরে দেখি আবীর মেয়েটার দিকে হা করে চেয়ে আছে । কেন জানিনা একটু রাগ হয়েছিল আবীরের ওপর। মেয়েটা যে আমাদের আড্ডা শুনে মজা পেয়েছে সেটা বুঝলাম যখন দেখলাম আমাদের কথা শুনে মুচকি হাসছে । আমরা যে সেটা লক্ষ্য করেছি সেটা বুঝতে পেরে চুপ করে গেছিলো পরে ।

    শনিবার ছিল দিনটা, তাই দুপুর দুটো নাগাদ ছুটি হয়ে গেল স্কুল । আমরা রোজকার মতো সবার শেষে বেরোলাম ক্লাস থেকে । তিনজনে হেটে যাচ্ছি বাড়ির দিকে কথা বলতে বলতে হথাৎ নয়ন আমাদের থামিয়ে দিয়ে বলল "ওই দেখ সেই মেয়েটা । আমাদের ওদিকেই যাচ্ছে । চল ,দেখি কোনদিকে যায় " । সামনে তাকিয়ে দেখি হ্যাঁ তাইতো ,সেই মেয়েটাই বটে । আমাদের থেকে ৫০ মিটার দুরে হবে বড়জোর , আমাদের বাড়ির ওদিকেই যাচ্ছে । রোদ টা ভালই পরেছে দুপরে তাই হাথ দিয়ে রোদ থেকে চোখ টাকে আরাল করে সোজা চলছে ।ছাতা আনেনি বোধহয় । নয়ন ইয়ারকি  করে বলল " যা সৃজিত তোর ছাতাটা দিয়ে আয় , কষ্ট হচ্চে মনেহয় " । তারপর দুজনেই হাসতে শুরু করল হো-হো করে । বললাম
-তোদের দিতে হয় তোরা দিয়ে আয় । আমি নেই এসব এ ।

    মুখে তো যা বলার বলে দিলাম কিন্তু মনে হচ্ছিল কিছু একটা বাহানা তে গিয়ে একটু কথা বলতে পারলে বেশ হয় । খেয়াল হোলো  হাঠতে হাঠতে প্রায় ওর কাছাকাছি চলে এসেছি । হঠাৎ দেখি মেয়েটা রাস্তা থেকে বাম দিকে বেকে সরকারি কোয়াটারের বড় গেটেটার  মধ্যে দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল । একবার পেছনে তাকিয়েছিল গেটের ভিতরে গিয়ে । চোখে চোখ পরতেই লক্ষ্য করলাম একটু মুচকি হাসি , আবার মাথা ঘুরিয়ে চলে গেল ও । পাড়ার গলিটা আসতেই আবীরকে বিদায় জানিয়ে বললাম " বিকেলে তারাতারি চলে যাস মাঠে , ম্যাচ আছে কিন্তু " । আবীর মাথা নারিয়ে চলে গেল ।  আমি আর নয়ন একই পাড়ায় থাকি আর আবীরের বাড়ি টা আরও দুটো পাড়া পেরিয়ে । বাড়ি ফিরে সেদিন খেয়াল করলাম আজ মনটা অন্য দিনের থেকে বেশি খুশী ।

     বিকেলে খেলে যখন ফিরছিলাম তখন মেজাজ টা খারাপ । নয়ন আজ আবার গোল মিস করেছে দুবার । ওরকম পসিশন থেকে কেউ গোল মিস করে ? । কত কষ্ট করে একটা গোল দাগালাম তাও হারতে হল নায়ন টার জন্য  । বাড়ি ফিরে দেখি বসবার ঘড়ে সোফায় একজন ভদ্রলোক আর এক ভদ্রমহিলা । ভদ্রলোকটির বয়েস আমার বাবার মত এবং মিহিলাটি মায়ের বয়েসি হবে । আমায় দেখে মাহিলাটি বলে উঠলেন
- এ ই বুঝি সৃজিত ? বাঃ কত বড় হয়ে গেছে ।

    কিছু বুঝতে না পেরে মায়ের দিকে তাকালাম । মা ঈশারা করে প্রনাম করার কথা বলতে অগত্যা আমিও তাই করলাম । ওনারা আশীর্বাদ করলেন "বেঁচে থাকো বাবা বেঁচে থাকো " । বাবাও আজ তারাতারি বাড়ি ফিরেছেন শনিবার বলে । উনি আরেকটা সোফায় এসে বসে আগন্তুকদের পরিচয় দিলেন । বাবা যা বললেন তার সারমর্ম হল এই যে - " লোকটি বাবার ছোটোবেলার বন্ধু  শ্যামসুন্দর সেন , একসঙ্গে পরতেন বাবার সঙ্গে ।  রেল এর ইঞ্জিনিয়ার , এখানে বদলি হয়ে এসেছেন । ভদ্রমহিলাটি তার স্ত্রী সুলেখা সেন । কাল এ নাকি এখানে এসেছেন , এই পাসের সরকারি কোয়াটারে থাকছেন এখন । "  সঙ্গে সঙ্গে কিছু একটা মনে হল কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগে লোকটি মানে কাকুটি জিজ্ঞেস করে বসলেন
- তুমি শ্যামপুর হাইস্কুলে পরো না ? আমার মেয়েকে মানে মিতালিকেও তো ওখানে অ্যাডমিশন করালাম   ১১ সায়েন্স এ । তুমিও সায়েন্স না ?
হঠাত করে বুকের মধ্যে ছাঁৎ করে উঠল । এক অজানা কারনে মন টা খুশিতে ভরে উঠল কয়েক মুহূর্তের মধ্যে । সকালের মেয়েটার মুখ ভেসে উঠল চোখের সামনে । ফুটবলের হার টা ভুলে গেছি ততক্ষনে । উত্তেজনা টা যথাসম্ভব চেপে উত্তর দিলাম
-হ্যাঁ , আমিও ১১ সায়েন্স ।
-পরিচয় হয়েছে ?
-না হয়নি এখনো ।
-ওহ আচ্ছা , আমি পরিচয় করিয়ে দেবো নাহয় । মিতালি এখানে নতুন তো , তাই যদি একটু সাহায্য লাগে দেখো । মানে ,এখানে তেমন কারো সঙ্গে পরিচয় হয়নি তো ।
আমি কাকুর মুখের কথা থামিয়ে দিয়েই বললাম " নিশ্চই করব যদি দরকার হয় " । মা আমায় থামিয়ে বলল " ও আপনি কোন চিন্তা করবেন না । আমরা আছি তো , আপনাদের কোন অসুবিধে হবে না " ।
 এবার বাবা আমায় ডেকে বলল " যা , খেলে এসেছিস এবার গা ধুয়ে পরতে বস । আমরা কথা বলি । তুই যা " ।  আমি ও ঘর থেকে বেড়িয়ে নিজের ঘড়ে এসে বুঝতে পারলাম এক অজানা কারনে মন তা ছটফট করছে । বাথরুমে গিয়ে সাওয়ার টা চালিয়ে নিচে দারিয়ে পরলাম । কত কথা এখন মাথায় ঘোরাঘুরি করছে , সঙ্গে অদম্য এক খুশী ।  সাওয়ারের জল আজ সুধু আমার শরীরকে না , মনকেও শান্ত করে দিচ্ছে । এখন শুধু মাঝে আর এক দিন , পরশু সোমবার আবার দেখা হবে । রাতে শোবার সময় চোখবন্ধ করে ভাবতে ভাবতে বুঝলাম যে সময় যেন কাটছে না অপেক্ষায় ।


চলবে............
7

দ্বিতীয় আধ্যায়

By

  পুজার ছুটি তে প্রায় ছয় মাস পর বাড়ি এসেছি । অফিস এর কাজের চাপ ছেরে কদিন একটু শান্তি । আমার সেই পুরনো  শহর কলকাতা ,যেখানে আমার জন্ম , যেখানে কেটেছে আমার শৈশব । বাড়ি ফিরে সেদিন রাতে সামনের বারান্দা তে বসে  পুরনো সব কথা গুলো মনে পরে জাচ্ছিল তাই মনটা একটু  খারাপ হয়ে গেছিল । পরদিন  সায়ন এর সঙ্গে ঘুরতে বেরবো , সেরকম এ কথা হয়ে আছে । রাত বেশি না করে শুয়ে পরেছি তারাতারি , অনেক দিন পর আবার আমার সেই পুরনো বিছানা , পুরনো পাস বালিশ । ঘুমতে বেশি দেরি লাগেনি , শোয়া  মাত্র  চোখে ঘুম ।

   পরদিন বিকেল ৪ টে সায়নের বাড়ি হাজির হলাম । অনেক দিন পর দেখা , আমায় জরিয়ে ধরে বলল:
- কেমন আছিস ?
-এই ত দেখতেই পাচ্ছিস, চলে যাচ্ছে কোনো রকম  ।
তারপর কিছুক্ষন এই কথা সেই কথা বলে আমরা বেরিয়ে পরলাম হাঠটে , হেটে ঘোরা টা আমাদের দুজনের এ পছন্দ । স্কুল থেকে বেরিয়ে ওরকম কত ঘুরেছি ,  রাস্তার মোর থেকে দেয়ালের ইট সবএ ছিল চেনা । সেই  পুরনো গলি গুলো এখন একটু বদলেছে কিন্তু বেশির ভাগ টাই আগের মত । আমরা আমাদের স্কুল বেলার কথা গুলো মনে করে করে নিজেদের মাঝে হাসাহাসি । এখানে এই করেছি , ওখানে ওই করেছি  এইসব গল্প ।

  দিন গুলো কত তারাতারি কেটে গেল , এই সেদিন এ তো   মাধ্যামিক দিলাম । এর মদ্ধে ৭ বছর যে কখন পেরিয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি  ! এই তো সেদিন এ বাইক চালানো শিখতে গিয়ে পায়ে চোট পেয়েছিলাম , এর মদ্ধে এতটা সময় যে পেরিয়ে গেছে টা আন্দাজ এ করা গেল না । এসব কথা ভাবতে ভাবতে হাটছি , সায়ন এর ডাকে ফিরে তাকালাম । দেখলাম সামনে গলির মুখে একটা চায়ের দোকান , ও সেই দিকে ইশারা করছে ।  অনেক দিন পর কলকাতার রাস্তায় মাটির ভারে চা , ব্যাপারটা একটু নষ্টালজিক  টাই আমি মানা করিনি জদিও আমার চায়ের প্রতি কোনো ভালবাসা নেই । পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেট টা বার করে ধরিয়ে নিয়েছি ততক্ষনে  ।

 দোকানে টাকা মিটিয়ে সামনের গলিটায়  ঢুকে দু পা হাঠার পর এ থমকে দারালাম , সামনে একটা মেয়ে ; " বিজায়া " ।  সময় টা একটু থেমে গিয়ে যেন আগের অনেক কথা মনে করিয়ে দিল । বিজায়াকে আমি স্কুল থেকে চিনি । শুধু চিনি বললে ভুল হবে , ও আমার শৈশবের প্রথম প্রেম । স্কুল এ খেলা বা সাহস এর জন্য বরাবর  আমার  নাম ছিল কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো দিন সাহস টা কাজে লাগেনি । চেষ্টা যে করিনি তা নয় , অনেক বার করেছি কিন্তু কোনদিন সাহস করে উঠতে পারিনি । দুর থেকে দেখে গেছি শুধু , সামনে পরে গেলে বোবার  মত চুপ করে থাকতে হয়েছে । ক্লাস ৯ এর ভালেন্তাইন্স ডে তে একটা কার্ড কিনেছিলাম ওর জন্য, সেটা আজও আমার ফাইল এর ব্যাগটায় পরে আছে  । একবার পিছু নিয়েছিলাম  স্কুল ছুটির পর ,  ও বুঝতে পেরে পেছনে ঘুরে আমার দিকে তাকাতেই আমি এক দৌরে ফিরে এসেছিলাম । তার পর এই নিয়ে অনেক প্যাক খেয়েছি বন্ধু দের কাছে কিন্তু ওসব গায়ে লাগাইনি ।

সেদিন টা এখনো মনে আছে যেদিন বৃষ্টির জন্য তারাতারি ছুটি হয়েছিল , বাইরে তখনো খুব বৃষ্টি পরছে আর আমরা স্কুল এর গেটের সামনে দারিয়ে একটু কমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম । পাশে ঘুরে দেখি ও আমার পাশে দারিয়ে , ঘুরতেই চোখাচুখি হতেই আমি মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম ।  ও ডেকে বলেছিল " আমায় একটু তোর ছাতায় এগিয়ে দিবি ?" ।  কি বলব বুঝতে পারিনি , সুধু মুখ থেকে আপনা আপনি বেরিয়ে এল " হ্যা , চল " । ওটাই প্রথম এবং শেষ কথা ওর সঙ্গে । কিন্তু ভগবানের মনে অন্য কিছু ছিলো বোধহয় , বৃষ্টিটা থিক তখনই থেমে গেছিলো । ও বেরিয়ে গিয়ে একবার পেছনে ঘুরে একটু হেসে হাথ নারিয়ে " বাই বাই " বলে চলে গেল । আমিও একবার হাথ নেরেছিলাম বোকার মতন এটুকু মনে আছে ।

    সায়ন আমার কাধে একটু নারা দিতে আমার ঘোর ভাঙল  ফিরে দেখি বিজায়া  আমাদের সামনা সামনি চলে এসেছে । কি করব বুঝতে পারার আগে বিজায়া ই বলল :
- কিরে ? চিনতে পারছিস না ?
- হ্যা রে , তুই বিজায়া  না ?
- মনে আছে তাহলে ! কি করিস এখন ?
- একটা IT Company   তে কাজ করছি , পুনে তে । তুই  কি করছিস ?
- বেকার মেয়ে , চাকরি খুজছি । দুটো বাচ্চা কে পরাই ,এই পরাতে যাচ্ছি ।
- শুনেছিলাম তোর বিয়ে হয়ে গেছে ! তোর বর টা কেমন ? ভাল আছে তো সবাই ?

  দেখলাম ও মাথা নিচু করে নিয়েছে , মুখ টা ফেকাসে হয়ে গেছে । কারন টা বোঝার আগে ও আবার বলতে শুরু করল :
- সে আর নেই রে , বিয়ের ২ মাস পর মারা গেছে । Army তে ছিল ও ,৩ মাস আগে কাশ্মির এ জঙ্গি হামলায় ............।।
বলতে বলতে ওর চোখের কোনা থেকে জল বেরিয়ে এসেছে , সেটা সন্ধের হাল্কা আলোতেও বুঝতে পারলাম.........। আমার ই ভুল কপালে সিদুর নেই সেটা খেয়াল করা উচিত ছিল ,  এই সময় কি বলব জানা নেই সায়ন এর দিকে তাকিয়ে দেখি ও আমার দিকে তাকিয়ে । মনে একটু সাহস জুগিয়ে বললাম :

-  Sorry রে , আমি ঠিক জানতাম না বেপার টা , মানে ...।
ও আমার মুখের কথা থামিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল
- আরে ঠিক আছে , সব এ আমার কপাল ।

    আমি আর সাহস করে দারাতে পারলাম না ওই পরিস্তিথি তে । কি বলা উচিৎ  জানিনা । আরও দু একটা  কথা বলে বিদায় নিলাম ।  যাবার সময় মস্করা করে বলে গেল " কিরে ? আজ সঙ্গে ছাতা আনিসনি ? বৃষ্টি আসবে তো  । বাই , পরে দেখা হবে "। স্কুল এর সেই কথা ওর মনে আছে ভেবে বেশ ভাল এ লাগলো আবার ওর পরিস্তিথি ভেবে খারাপ ও লাগছিল । তাকিয়ে রইলাম জতদুর পর্যন্ত ওকে দেখা যায় ।

     যে হাসিখুশি মেয়েটাকে আমি চিনতাম তাকে আজ এরকম দেখতে হবে ভাবতে পারিনি ।  ভগবান যা করে মঙ্গলের জন্য করে সুনেছিলাম কিন্তু এখানে কি মঙ্গল , কার মঙ্গল বুঝতে পারিনি । সায়ন আমায় নারা দিয়ে বলল " চল এবার , ওদিক টা যাই " ।আমিও হাঠতে সুরু করলাম , কিন্তু সেদিন মনটা আর কিছুতেই ভাল হয়নি ।


এটা ছিল প্রায় ২ বছর আগের গল্প । আজ আমার বিয়ে  গোধুলি  লগ্নে  , একটু পর এ বেরোতে হবে তাই যাবার আগে আমার গল্পটা লিখে গেলাম । ওই তো আমার বিয়ের কার্ডটা পরে আছে , বড় বড়  করে লেখা


"SRIJIT WEDS BIJAYA" .


Inicio
 
Designed By © Nihar