part 1
সেদিন স্কুল শেষে বাড়ি ফিরছিলাম , ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেল । বাড়ির গলিটায় ঢোকার আগে একটা সরকারি কোয়াটার পেরে । ৪ তলার ২ টো বিল্ডিং, সেগুলো পাঁচিল দিয়ে ঘেরা আর সামনে একটু বাগান মতো আছে । বাগান আর নেই , পরিচর্যার অভাবে আগাছায় ভরা । ওটার সামনে থেকে আসার সময় দেখলাম গেটের সামনে একটা বড় গাড়িতে মাল বোঝাই করা আর পাশে একটা ট্যাক্সি । মনেহয় নতুন কেউ এসেছে এখানে । এমনিতেই দেরি হয়ে গেছিলো ফিরতে তাই আর সময় না বাড়িয়ে তারাতারি ফিরে এলাম বাড়ি ।
পরদিন ক্লাসে এসে রোজকার মতো লাস্ট বেঞ্চে গিয়ে বসলাম নায়নের পাশে । আমি নয়ন আর আবীর সেই ক্লাস ফাইভ থেকে এই স্কুলে পরছি । স্কুলের প্রথম দিন দেরি করে আসার জন্য আমরা শেষ বেঞ্চে জায়গা পেয়েছিলাম , তারপর থেকে ওটাই আমাদের পাকা জায়গা । ক্লাসরুম পাল্টেছে কিন্তু আমাদের শেষ বেঞ্চ টা কেউ কেরে নিতে পারেনি । এখন তো ওটা আমাদের কেনা জায়গার মতো হয়ে গেছে , ভুল করেও এটায় কেউ বসেনা আমরা ছাড়া । মিনিট দুয়েক পর আবীর চলে এল , বেঞ্চের কাছে এসে আমার পাশে ব্যাগ টা রেখে বলল
- সুনতে পেলাম আমাদের ১১ সায়েন্স এ একটা নতুন মেয়ে এসেছে ।
- এই সময় নতুন অ্যাডমিশন ? ক্লাস তো প্রায় ১ মাস আগেই শুরু হয়ে গেছে ! সে যা হয় হোক , আমার কি !
বলে আমি একটু সরে ওকে বসার জায়গা করে দিলাম । একে একে সবাই প্রায় চলে এসেছে । স্কুল সুরুর ঘণ্টা পরে গেছে । আমরা তখন আড্ডায় মত্ত , খেয়াল করিনি স্যার যে কখন চলে এসেছেন । সবাইকে চুপ করে যেতে দেখে ঘুরে দেখি স্যার চলে এসেছেন । আমরাও দারালাম ।স্যার সবাইকে হাথ নারিয়ে বসতে ঈশারা করলেন । বসার পর খেয়াল করলাম যে স্যার এর পাশে একটা মেয়ে । আগে দেখিনি কোনদিন , বোধহয় সেই নতুন মেয়েটা যার কথা আবীর বলছিল । স্যার বলতে শুরু করেছেন ততক্ষনে
- এ তোমাদের নতুন বন্ধু মিতালি সেন , আজ এখানে এসেছে । দেরি করে অ্যাডমিশন নিয়েছে তাই তোমরা সবাই একটু হেল্প কোরো ওকে ।
আরও অনেক কিছু বলেছিলেন স্যার কিন্তু সেগুলো শোনা হয়নি । আমি ওর দিকে তাকিয়ে কখন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেছি বুঝতে পারিনি । আর পাঁচটা সাধারন মেয়ের মতো ও নয় , একটু আলাদা । অন্তত প্রথম দেখায় তাই ই মনে হয়েছিল । বাকি মেয়েদের মতো মেয়েটা রোগা নয় ,আবার মোটাও না । চুল পরিপাটি করে বাধা । চোখে একটা শান্ত ভাব , মুখে হাল্কা হাসি । শান্ত হয়ে নিচের দিকে মুখ করে দারিয়ে আছে । মুখটা খুব মায়াবি ,চোখ ফেরাতে পারিনি কয়েক মুহূর্ত । তারপর দেখলাম আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে এবং আমাদের একটা বেঞ্চ আগে এসে বসল । স্যার এর দিকে তাকিয়ে দেখি স্যার আমাদের বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে । আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল
- কোনো রকম অসুবিধা যদি ওর হয় তাহলে কি করে তোদের সায়েস্তা করতে হয় আমার জানা আছে ।
বলে স্যার নিজের চেয়ারে বসে নাম ডাকা শুরু করলেন । আমরা ভালই বুঝতে পেরেছিলাম যে শেষের হুমকি টা আমাদের এ জন্য । বাঁদরামি করার জন্য যে আমাদের সুখ্যাতি আছে সেটা আমরা ভালো করেই জানি । কত ক্লাস যে আমাদের কান ধরে ক্লাসের বাইরে দারিয়ে থাকতে হয়েছে গোনা নেই ! আগে ওটাকে উপভোগ করতাম কিন্তু এখন একটু গায়ে লাগে । পাশে ঘুরে দেখি আবীর মেয়েটার দিকে হা করে চেয়ে আছে । কেন জানিনা একটু রাগ হয়েছিল আবীরের ওপর। মেয়েটা যে আমাদের আড্ডা শুনে মজা পেয়েছে সেটা বুঝলাম যখন দেখলাম আমাদের কথা শুনে মুচকি হাসছে । আমরা যে সেটা লক্ষ্য করেছি সেটা বুঝতে পেরে চুপ করে গেছিলো পরে ।
শনিবার ছিল দিনটা, তাই দুপুর দুটো নাগাদ ছুটি হয়ে গেল স্কুল । আমরা রোজকার মতো সবার শেষে বেরোলাম ক্লাস থেকে । তিনজনে হেটে যাচ্ছি বাড়ির দিকে কথা বলতে বলতে হথাৎ নয়ন আমাদের থামিয়ে দিয়ে বলল "ওই দেখ সেই মেয়েটা । আমাদের ওদিকেই যাচ্ছে । চল ,দেখি কোনদিকে যায় " । সামনে তাকিয়ে দেখি হ্যাঁ তাইতো ,সেই মেয়েটাই বটে । আমাদের থেকে ৫০ মিটার দুরে হবে বড়জোর , আমাদের বাড়ির ওদিকেই যাচ্ছে । রোদ টা ভালই পরেছে দুপরে তাই হাথ দিয়ে রোদ থেকে চোখ টাকে আরাল করে সোজা চলছে ।ছাতা আনেনি বোধহয় । নয়ন ইয়ারকি করে বলল " যা সৃজিত তোর ছাতাটা দিয়ে আয় , কষ্ট হচ্চে মনেহয় " । তারপর দুজনেই হাসতে শুরু করল হো-হো করে । বললাম
-তোদের দিতে হয় তোরা দিয়ে আয় । আমি নেই এসব এ ।
মুখে তো যা বলার বলে দিলাম কিন্তু মনে হচ্ছিল কিছু একটা বাহানা তে গিয়ে একটু কথা বলতে পারলে বেশ হয় । খেয়াল হোলো হাঠতে হাঠতে প্রায় ওর কাছাকাছি চলে এসেছি । হঠাৎ দেখি মেয়েটা রাস্তা থেকে বাম দিকে বেকে সরকারি কোয়াটারের বড় গেটেটার মধ্যে দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল । একবার পেছনে তাকিয়েছিল গেটের ভিতরে গিয়ে । চোখে চোখ পরতেই লক্ষ্য করলাম একটু মুচকি হাসি , আবার মাথা ঘুরিয়ে চলে গেল ও । পাড়ার গলিটা আসতেই আবীরকে বিদায় জানিয়ে বললাম " বিকেলে তারাতারি চলে যাস মাঠে , ম্যাচ আছে কিন্তু " । আবীর মাথা নারিয়ে চলে গেল । আমি আর নয়ন একই পাড়ায় থাকি আর আবীরের বাড়ি টা আরও দুটো পাড়া পেরিয়ে । বাড়ি ফিরে সেদিন খেয়াল করলাম আজ মনটা অন্য দিনের থেকে বেশি খুশী ।
বিকেলে খেলে যখন ফিরছিলাম তখন মেজাজ টা খারাপ । নয়ন আজ আবার গোল মিস করেছে দুবার । ওরকম পসিশন থেকে কেউ গোল মিস করে ? । কত কষ্ট করে একটা গোল দাগালাম তাও হারতে হল নায়ন টার জন্য । বাড়ি ফিরে দেখি বসবার ঘড়ে সোফায় একজন ভদ্রলোক আর এক ভদ্রমহিলা । ভদ্রলোকটির বয়েস আমার বাবার মত এবং মিহিলাটি মায়ের বয়েসি হবে । আমায় দেখে মাহিলাটি বলে উঠলেন
- এ ই বুঝি সৃজিত ? বাঃ কত বড় হয়ে গেছে ।
কিছু বুঝতে না পেরে মায়ের দিকে তাকালাম । মা ঈশারা করে প্রনাম করার কথা বলতে অগত্যা আমিও তাই করলাম । ওনারা আশীর্বাদ করলেন "বেঁচে থাকো বাবা বেঁচে থাকো " । বাবাও আজ তারাতারি বাড়ি ফিরেছেন শনিবার বলে । উনি আরেকটা সোফায় এসে বসে আগন্তুকদের পরিচয় দিলেন । বাবা যা বললেন তার সারমর্ম হল এই যে - " লোকটি বাবার ছোটোবেলার বন্ধু শ্যামসুন্দর সেন , একসঙ্গে পরতেন বাবার সঙ্গে । রেল এর ইঞ্জিনিয়ার , এখানে বদলি হয়ে এসেছেন । ভদ্রমহিলাটি তার স্ত্রী সুলেখা সেন । কাল এ নাকি এখানে এসেছেন , এই পাসের সরকারি কোয়াটারে থাকছেন এখন । " সঙ্গে সঙ্গে কিছু একটা মনে হল কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগে লোকটি মানে কাকুটি জিজ্ঞেস করে বসলেন
- তুমি শ্যামপুর হাইস্কুলে পরো না ? আমার মেয়েকে মানে মিতালিকেও তো ওখানে অ্যাডমিশন করালাম ১১ সায়েন্স এ । তুমিও সায়েন্স না ?
হঠাত করে বুকের মধ্যে ছাঁৎ করে উঠল । এক অজানা কারনে মন টা খুশিতে ভরে উঠল কয়েক মুহূর্তের মধ্যে । সকালের মেয়েটার মুখ ভেসে উঠল চোখের সামনে । ফুটবলের হার টা ভুলে গেছি ততক্ষনে । উত্তেজনা টা যথাসম্ভব চেপে উত্তর দিলাম
-হ্যাঁ , আমিও ১১ সায়েন্স ।
-পরিচয় হয়েছে ?
-না হয়নি এখনো ।
-ওহ আচ্ছা , আমি পরিচয় করিয়ে দেবো নাহয় । মিতালি এখানে নতুন তো , তাই যদি একটু সাহায্য লাগে দেখো । মানে ,এখানে তেমন কারো সঙ্গে পরিচয় হয়নি তো ।
আমি কাকুর মুখের কথা থামিয়ে দিয়েই বললাম " নিশ্চই করব যদি দরকার হয় " । মা আমায় থামিয়ে বলল " ও আপনি কোন চিন্তা করবেন না । আমরা আছি তো , আপনাদের কোন অসুবিধে হবে না " ।
এবার বাবা আমায় ডেকে বলল " যা , খেলে এসেছিস এবার গা ধুয়ে পরতে বস । আমরা কথা বলি । তুই যা " । আমি ও ঘর থেকে বেড়িয়ে নিজের ঘড়ে এসে বুঝতে পারলাম এক অজানা কারনে মন তা ছটফট করছে । বাথরুমে গিয়ে সাওয়ার টা চালিয়ে নিচে দারিয়ে পরলাম । কত কথা এখন মাথায় ঘোরাঘুরি করছে , সঙ্গে অদম্য এক খুশী । সাওয়ারের জল আজ সুধু আমার শরীরকে না , মনকেও শান্ত করে দিচ্ছে । এখন শুধু মাঝে আর এক দিন , পরশু সোমবার আবার দেখা হবে । রাতে শোবার সময় চোখবন্ধ করে ভাবতে ভাবতে বুঝলাম যে সময় যেন কাটছে না অপেক্ষায় ।
চলবে............




